করোনা হটস্পট হাটহাজারী, এক দিনেই রেকর্ড আক্রান্ত ২৮


মোট আক্রান্ত ১২৩, মৃত্যু ৪

চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা এখন করোনার হটস্পটে পরিণত হয়েছে। হাটহাজারীতে এক দিনে সর্বোচ্চ ২৮ করোনা পজিটিভ রোগীর রেকর্ড করেছে। এ পর্যন্ত হাটহাজারীতে করোনাভাইরাসে মোট আক্রান্ত হয়েছে ১২৩ জন। ইতিমধ্যে হাটহাজারীতে মৃত্যু হয়েছে ৪ জন কভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী।

এদের মধ্যে গত শুক্রবার (২৯ মে) এক দিনেই মৃত্যু হয়েছে দুজনের। গতকাল শনাক্তদের মধ্যে রয়েছেন হাটহাজারী থানার এক পুলিশ কর্মকর্তাসহ পুলিশের তিন সদস্য, একজন সংবাদকর্মী, হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন স্বাস্থ্যকর্মী, সোনালী ব্যাংক হাটহাজারী শাখার চার কর্মকর্তা। সোনালী ব্যাংক হাটহাজারী শাখার ১৭ জন কর্মকর্তা কর্মচারীর মধ্যে ব্যবস্থাপকসহ ১৪ জন কর্মকর্তা কর্মচারী করোনা আক্রান্ত হওয়াতে শাখাটি আগামী ২০ জুন পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিন্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

হাটহাজারী উপজেলায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ, বিআইটিআইডি ও চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ইউনিভার্সিটি-সিভাসু হতে দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী গতকাল রবিবার এক দিনেই ২৮ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। করোনা শনাক্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা।

শনাক্তদের মধ্যে রয়েছেন হাটহাজারী থানার এক পুলিশ কর্মকর্তাসহ পুলিশের তিন সদস্য, একজন সংবাদকর্মী, হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন স্বাস্থ্যকর্মী, সোনালী ব্যাংক হাটহাজারী শাখার চার কর্মকর্তা এবং হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের এক আনসার সদস্য ও ইউএনওর সহকারী। 

এছাড়া উপজেলার বুড়িশ্চর ইউনিয়নের নজুমিয়া হাট, মেখল ইউনিয়নের ফকিরহাট, ছিপাতলী, আমানবাজার, চিকনদন্ডী, ফতেপুর, মির্জাপুর এবং হাটহাজারী পৌরসভার আলমপুর, আলীপুর, পূর্ব দেওয়াননগর, বাস স্টেশন, কামালপাড়া এলাকায় করোনা সনাক্ত  হয়েছে বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে ৫ বছর ও আট বছর বয়সী দুজন শিশুও রয়েছে। 

হাটহাজারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ এপ্রিল থেকে গতকাল পর্যন্ত মোট নমুনা প্রেরণ করা হয়েছে ৫৪৭ জনের, ফলাফল পাওয়া গেছে ৫১৮ জনের। প্রাপ্ত ফলাফলের  মধ্যে করোনা পজিটিভ-১১৬ জন। উপজেলায় পজিটিভিটির শতকরা হার-২২.৩৯। বর্তমানে হাটহাজারী উপজেলায় মোট করোনা রোগী- ১২৩ জন।

হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে নমুনা প্রেরণ কিন্তু অন্য উপজেলা বা সিটি কর্পোরেশন এ অবস্থানকারী রোগী-৯ জন। এছাড়া অন্য জায়গা থেকে নমুনা দেওয়া হাটহাজারী উপজেলার রোগী-১৬ জন। এ পর্যন্ত প্রথম ফলোআপ নেগেটিভ-৮ জন। আক্রান্তদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া রোগীর সংখ্যা-১০ জন। উপজেলায় গতকাল রবিবার পর্যন্ত কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে-৪ জন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (২৮ মে) রাতে ছিপাতলী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নেয়ামত আলী কম্পানি বাড়ির বাসিন্দা রেহেনা আক্তার (৫০) মারা যান। ওই রাতেই নমুনা প্রতিবেদনে তার করোনা পজিটিভ আসে।

এছাড়া বুধবার (২৭ মে ) করোনা উপসর্গ নিয়ে বুড়িশ্চর ইউনিয়নের দক্ষিণ বুড়িশ্চর মন্টু তালুকদার বাড়ির কাঞ্চন তালুকদার (৫৫) মারা যান। মৃত্যুর এক দিন পর নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে জানা যায় তার করোনা পজিটিভ। এর আগে ধলই ইউনিয়নের শিলা আক্তার (৩৩) নামের এক মহিলা মারা যান করোনা আক্রান্ত হয়ে। রবিবার (২৪ মে) রাতে আমান বাজারের নুরনাহার ভবনের মালিক ফরিদা বেগম (৪৫) নামের এক নারী করোনা আক্রান্ত  হয়ে মারা যান।

গত ২৭ এপ্রিল হাটহাজারী উপজেলার ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলীর ওষুধ কম্পানির এক বিক্রয় প্রতিনিধির প্রথম করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। এরপর গত ২৬ মে পর্যন্ত দু-এক দিন পরপর এক-দুজন করে বাড়ছিল আক্রান্তের সংখ্যা। এর মধ্যে গত ২৭ মে এক দিনে আক্রান্ত হন ৮ জন। এর পরদিন আক্রান্ত সংখ্যা এক লাফে উঠে হয়ে যায় ২৬ জনে। মাঝে চারদিন কিছু কমে গেলেও গতকাল রবিবার আগের রেকর্ড ভেঙে দিয়ে এক দিনেই আক্রান্ত হয় ২৮ জন। এক দিনে চট্টগ্রামের কোনো উপজেলায় করোনায় এত আক্রান্তের সংখ্যা এটি সর্বোচ্চ বলে হাটহাজারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানিয়েছে।

গতকাল রবিবার হাটহাজারী মডেল থানার এক এএসআই ও এক ট্রাফিক সদস্যসহ তিন পুলিশ সদস্যের করোনা শনাক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে হাটহাজারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও গাড়িচালকসহ মোট ১১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।

এছাড়া হাটহাজারীর আলীপুর গ্রামের ২টি পরিবারের দুজন শিশুসহ মোট ৬ জনের করোনা পজিটিভ এসেছে। পরিবারগুলোর অন্যান্য সদস্যদের এর আগে পজিটিভ শনাক্ত করা হয়েছিল। হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের এক আনসার সদস্যের এবং একজন কর্মকর্তার শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে হাটহাজারী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে করোনার উপসর্গ নিয়ে ইতিমধ্যে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। হাটহাজারীতে আক্রান্তের সংখ্যা মোট ১২৩ জন এবং মৃতের সংখ্যা ৩ নারী ও ১ জন পুরুষ। পৌর সদরের কাচারী সড়কের সোনালী ব্যাংক হাটহাজারী শাখায় ১৭ জন ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ব্যাংকের ব্যবস্থাপক, সেকেন্ড অফিসার ও আনসারসহ ১৪ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র ক্যাশ অফিসার আক্রান্তের পর পর একের পর এক অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা করায়। গত মঙ্গলবার ব্যাংকের নারীসহ দুই অফিসারের এবং বৃহস্পতিবার ব্যাংকের ব্যবস্থাপক, সেকেন্ড অফিসার ও আনসারসহ ৭ জনের পজিটিভ আসে।

এছাড়া আক্রান্তদের মধ্যে ব্যাংকে কর্মরত আনসার সদস্যও রয়েছেন। ব্যাংকের প্রথম আক্রান্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি কয়েক দিনের মধ্যে ছাড় পাবেন বলে জানা গেছে। বাকীরা হোম আইসোলেশনে আছেন বলে জানিয়েছেন সোনালী ব্যাংক হাটহাজারী শাখার ব্যবস্থাপক মিন্টু রাম দাশ।

এদিকে গতকাল রবিবার সোনালী ব্যাংক হাটহাজারী বাজার শাখার আরো চার কর্মকর্তার শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। এই নিয়ে শাখাটির প্রধান ব্যবস্থাপক মিন্টু রাম দাশ সহ মোট ১৪ জন কর্মকর্তা কর্মচারী করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়েছেন। শাখাটির প্রায় সব কজন কর্মকর্তা কর্মচারী আক্রান্ত হওয়ায় স্বাভাবিক ব্যাংকিং সেবা প্রদান সম্ভব হচ্ছে না। 

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিজে শাখাটি পরিদর্শন করেন এবং আপাতত শাখাটির কর্মকর্তা কর্মচারীরা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখতে অনুরোধ করেছেন। হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন সাংবাদিকদের জানান, ব্যাংকের কার্যক্রম আগামী ২০ জুন পর্যন্ত বন্ধ রাখার অনুরোধ করা হয়েছে। তবে, অতি জরুরি সেবা অর্থাৎ সরকারি বরাদ্দের বিল যেগুলো উত্তোলন না করলে ল্যাপস হবে এ জাতীয় সেবা চালু থাকবে। আক্রান্ত কর্মকর্তা কর্মচারীরা সুস্থ হয়ে ফিরে আসলে স্বাভাবিক সেবা পুরোদমে চালু হবে।

গতকাল রবিবার উপজেলায় এক দিনে রেকর্ডসংখ্যক ২৮ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু সৈয়দ মো. ইমতিয়াজ হোসাইন। তিনি বলেন, এটি গত ২৮ মে সংগ্রহ করা নমুনার ফলাফল। 
হাটহাজারী উপজেলা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবু সৈয়দ মো. ইমতিয়াজ হোসাইন গতরাতে এ প্রতিবেদককে জানান, হাটহাজারী উপজেলা এখন করোনা হটস্পটে পরিণত হয়েছে।

গতকাল রবিবার পর্যন্ত এক দিনে ২৮ জন আক্রান্ত হওয়া সর্বোচ্চ রেকর্ড। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ইমতিয়াজ আরো বলেন, হাটহাজারীতে সংক্রমণের হার অনেক বেড়ে গেছে। করোনা পজিটিভ রিপোর্ট পাওয়া অনেক রোগীর কোনো উপসর্গ দেখা যায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, উপসর্গ ছাড়াও অনেক করোনা আক্রান্ত রোগী আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছে। তাই বেঁচে থাকার জন্য ঘরে থাকা এবং একমাত্র ঘরে থাকাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ডাক্তার ইমতিয়াজ সবাইকে ঘরে অবস্থানের জোর দিয়ে বলেন, যদি নিতান্তই জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতে হয় তাহলে যেন সরকারি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা হয়। অন্যথায় মহাবিপদ থেকে কেউ রেহাই পাবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।

Share Button